এই বর্বরতা আইয়্যামে জাহিলিয়াকেও হার মানায় – এম এ মামুন উল হাসিব ভূঁইয়া

by • October 28, 2014 • InterviewComments (0)176

ছাত্র সংবাদ : ২৮ অক্টোবর ২০০৬ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় এ সম্পর্কে আপনার বক্তব্য জানতে চাই।
মামুন উল হাসিব ২৮ অক্টোবর ২০০৬ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কাল অধ্যায়। তৎকালীন চারদলীয় ঐক্যজোট সরকার একটি সফল নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন অবস্থায় দেশ পরিচালনা করছিলেন। কিন্তু ফ্যাসিবাদী আওয়ায়ামী লীগ বিরোধী দলের গাত্র জ্বালা হয় যে তারা অন্য কোন দলকে ক্ষমতায় আসীন দেখতে রীতিমতো নারাজ। আর তাই একগুঁয়ে এই দলটি তার পেটুয়া কর্মীবাহিনীকে লেলিয়ে দেয় জামায়াত-শিবিরের এক শান্তিপূর্ণ মিছিলের ওপর। তারা লগি-বৈঠা নিয়ে বেরিয়ে আসে রাজপথে। তাদের কয়েক মুহূর্তের তাণ্ডবে সমগ্র বিশ্ব অবলোকন করে বর্বর এক জাতির স্বরূপ। বিশ্বে নিন্দার ঝড় ওঠে এমন হামলার। এই কলঙ্কপূর্ণ অধ্যায়ের কালো দাগ জাতিকে বহু দিন বয়ে বেড়াতে হবে। এমনকি এই বর্বরতা জাতিকে আইয়্যামে জাহিলিয়াতকেও হার মানায়।
ছাত্র সংবাদ : বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির জন্যে ২৮ অক্টোবর ২০০৬ এর ভূমিকাকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?
মামুন উল হাসিব : ২৮ অক্টোবর ২০০৬ এর ধারাবাহিকতায় বর্তমান সময় সেই সময়ের সেই ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগ ফখরুদ্দীন সরকারের হাত হতে ক্ষমতায় আসীন হয় এবং ৫ বছর বহালতবিয়তে সরকার পরিচালনা করে শেষ পর্যন্ত সেই বহুল প্রশংসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এর মাধ্যমে নির্বাচন না দিয়ে আইন পাস এর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক পন্থা বিলুপ্ত করে। আর নির্বাচন হয় সরকার দলীয় মন্ত্রী-এমপিদের অধীনে। ফলে গণতন্ত্র নামক সোনার হরিণটি প্রভাতের ঊষা দেখার আগেই হারিয়ে যায় গহিন অরণ্যে। আর এরই ধারাবাহিকতায় ৫ জানুয়ারি ২০১৪ এর নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগ সরকার তাদের ক্ষমতার নিশ্চয়তা পেয়ে যায়। আর ঘোষণা দেয় ৪৫% ভোট পেয়েছে তারা। কী নির্লজ্জ তাদের বাচনভঙ্গি! নির্ভরশীল জরিপের দ্বারা প্রমাণিত, যেখানে ভোট কাস্ট হয়েছে ৯ লক্ষ ভোটারের মধ্যে মাত্র ১.৫ লক্ষ তা কিভাবে ৪৫% ভোট কাস্ট হয়? তাদের কি এই জ্ঞানটুকু নেই?
ক্ষমতা পেয়ে বর্তমান সরকার ‘মাইট ইজ রাইট’ প্রবাদটির যথার্থতা দেখিয়েছেন। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, জোর জুলুম, হামলা, মামলা জুজুর ভয় দেখিয়ে বিরোধী পক্ষকে তটস্থ করে ছেড়েছে পুলিশ, বিডিয়ার আদমী ব্যবহার করে। প্রশাসনকে শতভাগ নিজেদের করায়ত্ত করে যাচ্ছে। তাদের আচরণে মনে হচ্ছে বাংলার মাটিতে আওয়ামী বিরোধী মানেই দেশদ্রোহী রাজাকার, আলবদর, আস-শামস, রাষ্ট্রদ্রোহী, ষড়যন্ত্রকারী যদিও তারা এক্স আওয়ামী লিগিয়ান। এমনকি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীকেও তারা রাজাকার বলে ছেড়েছেন। আওয়ামী ফ্যাসিবাদ বিরোধী কোন বুদ্ধিজীবীকে তারা হেয়প্রতিপন্ন ও নাজেহাল করতে কুণ্ঠাবোধ করছে না। ঘটনাদৃষ্টে এমন মনে হচ্ছে যে, যদি কেউ আওয়ামী লীগ বা তাদের জোটে না থাকে, তবে তারা এই বাংলার আলো, বাতাসও গ্রহণ করার অধিকার হারাবে। সংবিধানে এই আইনটুকু পাস করানো সময়ের ব্যাপার মাত্র। আর এই সকল ঘটনা তাদের ফ্যাসিবাদী চেতনার বহিঃপ্রকাশ যার যাত্রা ২৮ অক্টোবর ২০০৬।
ছাত্র সংবাদ : ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা যাতে জাতিকে আর প্রত্যক্ষ করতে না হয় সে জন্য কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত?
মামুন উল হাসিব : জাতি আজ দ্বিধাবিভক্ত, মজলুম যখন ধরার বুকে সাহায্যকারী কাউকে না পায় তখন দু’হাত তুলে আকাশ পানে ফরিয়াদ করে। এই বিশ্বের অধিপতি, রাজাধিরাজ, সর্বদ্রষ্টা, সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী মহান আল্লাহর রহমতই তাদের প্রত্যাশা। কেননা তাদের সহায় আর কেউ অবশিষ্ট থাকে না। আমার বিশ্বাস মজলুমের আহাজারিতে আল্লাহর আরশ অনুরণিত হবেই। তবে হ্যাঁ, তাই বলেকি যারা চোখ থাকতেও অন্ধ নয়, কান থাকতেও বধির নয়, যারা বিশ্বাস করে আমাদেরকে একজনের নিকট জবাবদিহি করতে হবে। জবাবদিহি করতে হবে যে, তোমার যৌবন তুমি কি কাজ করে অতিবাহিত করেছ? আর সেই জবাবের প্রস্তুতি আমাকে নিতে হবে। আমিতো এই দায় থেকে মুক্তি পেতে পারব না। এই চেতনাকে বুকে ধারণ করে সর্বদলীয় ছাত্রঐক্যকে আজ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সকল ধরনের হিংসা, অহঙ্কার, লোভ ভুলে একটি লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। শুধু তাই নয় নজরুলের সংগ্রামী চেতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। তবেই যদি আমরা এই জালেম ফ্যাসিস্ট সরকার হতে মুক্তি পেতে পারি। আর এই পদক্ষেপ যুগান্তকারী পরিবর্তন এনে দিতে পারে।
ছাত্র সংবাদ : নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে দায়ের করা মামলা সরকার প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এটা কি মানবাধিকারের লংঘন নয়? এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য?
মামুন উল হাসিব : ২৮ অক্টোবর ২০০৬ সালে আওয়ামী পেটুয়া বাহিনীর তাণ্ডবে যারা নিহত হয়েছেন এবং যারা গুরুতর আহত হয়েছেন। যারা এই তাণ্ডবের দ্বারা ভীতিকর পরিস্থিতির শিকার, সমগ্র জাতি তাদেরকে কোন দিন ভুলবে না। একটি স্বাধীন জাতি কখনও এমন তাণ্ডবের শিকার হতে পারে না। সেই সময়ে নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে দায়ের করা মামলার সুবিচার পায়নি। বরং আওয়ামী সরকার মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য করেছে। এতে স্পষ্ট যে, আইনের শাসন এই বাংলায় আর অবশিষ্ট নেই। যাও ছিল তা ইতোমধ্যেই হরণ করা হয়েছে। কাজেই মানবাধিকার এটাতো জাদুঘরের পণ্য। সুউচ্চমূল্যে ক্রয় করে এয়ারকুলার যুক্ত বলরুমে শোপিজে সাজিয়ে রাখাই জাতির জন্য কল্যাণকর। যেখানে শোভা পাবে তরতাজা মানবাধিকার।
ছাত্র সংবাদ : স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরও স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে বিভেদ সৃষ্টিকে আপনি কোন দৃষ্টিতে দেখছেন?
মামুন উল হাসিব : এক সময়ের কথিত দেশদ্রোহী আগরতলার ষড়যন্ত্র মামলাধারী দল জানে, বোঝে এই বোঝা কত ভারী। যদি কোন দলের ঘাড়ে এই বোঝা চাপিয়ে দেয়া যায় তবে সে সহজেই নতজানু হতে বাধ্য। তাদের বাস্তবতার তিক্ত অভিজ্ঞতা খুবই রয়েছে। সেই থেকে তারা দেশপ্রেমী। কালের আবর্তে যারা তাদের বিরোধী তারা আজ দেশদ্রোহী, স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি, যুদ্ধাপরাধী তারা দেশের আলো বাতাস গ্রহণ করে ভিন দেশীদের জন্য কথা বলে কাজ করে। তারা কুলাঙ্গার তারা দেশের বোঝা। এই বোঝা কেটে ফেলতে পারলে জাতি মুক্ত। আপাতদৃষ্টে এমনটাই মনে হয়, কিন্তু মুদ্রার এ পিঠ ওপিঠের খবর তো জানা জরুরি। বাংলার মানুষ আজ প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ শিক্ষিত। আর বাকি যারা আছে তারা প্রযুক্তির এই উৎকর্ষতার যুগে সেই দলেই অন্তর্ভুক্ত। তার মানে জাতি আজ অন্ধ নয়। তারা দেখছে কোন সম্প্রদায় পাশের দেশের স্বার্থ রক্ষায় সর্বদা উৎগ্রীব, দেশের বিশাল বিশাল স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে পাশের রাষ্ট্রের স্বার্থকে কারা প্রাধান্য দিচ্ছে। কারা পাশের রাষ্ট্রের সরকার পরিবর্তনে কুণ্ঠিত হয়। কারা পাশের দেশের নতুন সরকারের আজ্ঞাবহ হতে মরিয়া হয়ে ওঠে। কারা পাশের রাষ্ট্রকে মোসাহেবের মতো জি হুজুর জি হুজুর বলতে জাতির অহঙ্কার, গর্ব পদদলিত করতে সঙ্কুচিত হয় না। তারা মনে করে নিজেদের আখের গোছাতে পারলেই, টাকার বিনিময়ে মাথা কিনে ফেলতে পারবেন। কারণ এই ব্যাপারটিতে বাংলাদেশী ভাই বোনেরা বিশ্বাসঘাতকতা করছে না। একটি নোট হলেই চলবে। একদিন দুদিন তো পোলাও খাওয়া চলবে। না হয় সারা বছর বা ৫ বছর নুন আনতে পান্তা ফুরাবে। কাঁচামরিচ কিনতে হবে ৩০০-৪০০ টাকায়। বাকিটুকু আর নাই বা বললাম।
হ্যাঁ বর্তমান সরকারের তুরুপের একটি তাশ হাতে থাকতে তো হবেই। এইটি হচ্ছে জাতিকে বিভক্ত করে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি ও বিপক্ষের শক্তি। এই চালটি চেলে বড় ফায়দা হাসিল করছে বর্তমান সরকার। যে জাতিকে এই বাংলার আলো, বাতাস, মাটিতে পরিপুষ্ট সে জাতি কখনও ঢালাওভাবে দেশদ্রোহী হতে পারে না। এর মধ্যে ‘কিন্তু’ আছে। আমাদেরকে সেই কিন্তুর খোঁজে ঘর ছাড়তে হবে না। একটু চিন্তা করলেই সব দিবালোকের মতো পরিষ্কার। আর তাই জ্ঞানী ভাই বোনদের বলব ওদের জালে পা দেয়ার আগে দেখে শুনে বুঝে নেবেন। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর কেন বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমার পরও স্বাধীনতার পক্ষে বিপক্ষে ইস্যুটি জাতির সামনে আনা হচ্ছে। জাতি আজ মহা সঙ্কটাপন্ন।
ছাত্র সংবাদ : আওয়ামী দুঃশাসনের হাত থেকে জাতিকে মুক্ত করার জন্য সকল ছাত্রসংগঠনের ঐক্যবদ্ধ হওয়া সময়ের অনিবার্য দাবি। এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী?
মামুন উল হাসিব : সর্বদলীয় ছাত্রসংগঠনের ঐক্যবদ্ধ হওয়া সময়ের অনিবার্য দাবি। ছাত্র ও যুবসমাজ একটি জাতির অকুতোভয় সৈনিক। বাংলার কবি-সাহিত্যিকরা সব সময়ই যুবসমাজ ও তরুণদের জয়গান গেয়েছেন। কাজী নজরুল তার যৌবনের গান প্রবন্ধে তরুণদের জয়-জয়কার ধ্বনিতে মুখরিত করেছেন। যৌবনই শক্তি, জড়াজীর্ণতাকে সতেজ করা, অন্ধকারকে আলোকিত করার একমাত্র শক্তি রাখে তরুণসমাজ। আর যদি এই তরুণসমাজ, যুবসমাজ, ছাত্রসমাজ, ঘুমন্ত অবস্থায় থাকে তবে অন্যদের দ্বারা জাতীয় কলঙ্ক মোচন করা সম্ভব নয়। যুব তথা ছাত্র সমাজই পারে জাতীয় যত কলঙ্করূপী বোঝা অপসারণ করে মেঘমুক্ত আকাশ স্বরূপে পরিবেশন করতে। আর তাই সর্বদলীয় ছাত্র-ঐক্য সংঘবদ্ধ হয়ে কাজ করবে যা সময়ের অনিবার্য দাবি।
ছাত্র সংবাদ : সমৃদ্ধ দেশ গঠনের জন্য ছাত্র ও যুব সমাজের উদ্দেশে আপনার বক্তব্য বলুন।
মামুন উল হাসিব : সর্বদলীয় ছাত্র ও যুব সমাজের একজন সদস্য হিসেবে আমি আমার জীবনকে প্রস্তুত করেছি শুধু শুধু বিলিয়ে দিতে নয়। নিজেকে একজন যোগ্য দেশপ্রেমিক হিসেবে গড়ে তুলব। আর নিজের ব্যক্তিজীবন, সমাজ জীবন, পারিবারিক জীবন তথা রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রতিষ্ঠিত করব। সাথে সাথে সৎ, যোগ্য, আদর্শ দেশপ্রেমিক নাগরিক গঠনে অগ্রণী ভূমিকা রাখব। আর এরই ধারাবাহিকতায় জীবনের কঠিন সায়াহ্নে যদি উপনীত হতে হয় তবে পিছপা হবো না।
লেখক : আহবায়ক, জাতীয় ছাত্রসমাজ, কেন্দ্রীয় কমিটিছাত্র সংবাদ : ২৮ অক্টোবর ২০০৬ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় এ সম্পর্কে আপনার বক্তব্য জানতে চাই।
মামুন উল হাসিব ২৮ অক্টোবর ২০০৬ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কাল অধ্যায়। তৎকালীন চারদলীয় ঐক্যজোট সরকার একটি সফল নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন অবস্থায় দেশ পরিচালনা করছিলেন। কিন্তু ফ্যাসিবাদী আওয়ায়ামী লীগ বিরোধী দলের গাত্র জ্বালা হয় যে তারা অন্য কোন দলকে ক্ষমতায় আসীন দেখতে রীতিমতো নারাজ। আর তাই একগুঁয়ে এই দলটি তার পেটুয়া কর্মীবাহিনীকে লেলিয়ে দেয় জামায়াত-শিবিরের এক শান্তিপূর্ণ মিছিলের ওপর। তারা লগি-বৈঠা নিয়ে বেরিয়ে আসে রাজপথে। তাদের কয়েক মুহূর্তের তাণ্ডবে সমগ্র বিশ্ব অবলোকন করে বর্বর এক জাতির স্বরূপ। বিশ্বে নিন্দার ঝড় ওঠে এমন হামলার। এই কলঙ্কপূর্ণ অধ্যায়ের কালো দাগ জাতিকে বহু দিন বয়ে বেড়াতে হবে। এমনকি এই বর্বরতা জাতিকে আইয়্যামে জাহিলিয়াতকেও হার মানায়।
ছাত্র সংবাদ : বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির জন্যে ২৮ অক্টোবর ২০০৬ এর ভূমিকাকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?
মামুন উল হাসিব : ২৮ অক্টোবর ২০০৬ এর ধারাবাহিকতায় বর্তমান সময় সেই সময়ের সেই ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগ ফখরুদ্দীন সরকারের হাত হতে ক্ষমতায় আসীন হয় এবং ৫ বছর বহালতবিয়তে সরকার পরিচালনা করে শেষ পর্যন্ত সেই বহুল প্রশংসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এর মাধ্যমে নির্বাচন না দিয়ে আইন পাস এর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক পন্থা বিলুপ্ত করে। আর নির্বাচন হয় সরকার দলীয় মন্ত্রী-এমপিদের অধীনে। ফলে গণতন্ত্র নামক সোনার হরিণটি প্রভাতের ঊষা দেখার আগেই হারিয়ে যায় গহিন অরণ্যে। আর এরই ধারাবাহিকতায় ৫ জানুয়ারি ২০১৪ এর নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগ সরকার তাদের ক্ষমতার নিশ্চয়তা পেয়ে যায়। আর ঘোষণা দেয় ৪৫% ভোট পেয়েছে তারা। কী নির্লজ্জ তাদের বাচনভঙ্গি! নির্ভরশীল জরিপের দ্বারা প্রমাণিত, যেখানে ভোট কাস্ট হয়েছে ৯ লক্ষ ভোটারের মধ্যে মাত্র ১.৫ লক্ষ তা কিভাবে ৪৫% ভোট কাস্ট হয়? তাদের কি এই জ্ঞানটুকু নেই?
ক্ষমতা পেয়ে বর্তমান সরকার ‘মাইট ইজ রাইট’ প্রবাদটির যথার্থতা দেখিয়েছেন। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, জোর জুলুম, হামলা, মামলা জুজুর ভয় দেখিয়ে বিরোধী পক্ষকে তটস্থ করে ছেড়েছে পুলিশ, বিডিয়ার আদমী ব্যবহার করে। প্রশাসনকে শতভাগ নিজেদের করায়ত্ত করে যাচ্ছে। তাদের আচরণে মনে হচ্ছে বাংলার মাটিতে আওয়ামী বিরোধী মানেই দেশদ্রোহী রাজাকার, আলবদর, আস-শামস, রাষ্ট্রদ্রোহী, ষড়যন্ত্রকারী যদিও তারা এক্স আওয়ামী লিগিয়ান। এমনকি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীকেও তারা রাজাকার বলে ছেড়েছেন। আওয়ামী ফ্যাসিবাদ বিরোধী কোন বুদ্ধিজীবীকে তারা হেয়প্রতিপন্ন ও নাজেহাল করতে কুণ্ঠাবোধ করছে না। ঘটনাদৃষ্টে এমন মনে হচ্ছে যে, যদি কেউ আওয়ামী লীগ বা তাদের জোটে না থাকে, তবে তারা এই বাংলার আলো, বাতাসও গ্রহণ করার অধিকার হারাবে। সংবিধানে এই আইনটুকু পাস করানো সময়ের ব্যাপার মাত্র। আর এই সকল ঘটনা তাদের ফ্যাসিবাদী চেতনার বহিঃপ্রকাশ যার যাত্রা ২৮ অক্টোবর ২০০৬।
ছাত্র সংবাদ : ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা যাতে জাতিকে আর প্রত্যক্ষ করতে না হয় সে জন্য কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত?
মামুন উল হাসিব : জাতি আজ দ্বিধাবিভক্ত, মজলুম যখন ধরার বুকে সাহায্যকারী কাউকে না পায় তখন দু’হাত তুলে আকাশ পানে ফরিয়াদ করে। এই বিশ্বের অধিপতি, রাজাধিরাজ, সর্বদ্রষ্টা, সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী মহান আল্লাহর রহমতই তাদের প্রত্যাশা। কেননা তাদের সহায় আর কেউ অবশিষ্ট থাকে না। আমার বিশ্বাস মজলুমের আহাজারিতে আল্লাহর আরশ অনুরণিত হবেই। তবে হ্যাঁ, তাই বলেকি যারা চোখ থাকতেও অন্ধ নয়, কান থাকতেও বধির নয়, যারা বিশ্বাস করে আমাদেরকে একজনের নিকট জবাবদিহি করতে হবে। জবাবদিহি করতে হবে যে, তোমার যৌবন তুমি কি কাজ করে অতিবাহিত করেছ? আর সেই জবাবের প্রস্তুতি আমাকে নিতে হবে। আমিতো এই দায় থেকে মুক্তি পেতে পারব না। এই চেতনাকে বুকে ধারণ করে সর্বদলীয় ছাত্রঐক্যকে আজ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সকল ধরনের হিংসা, অহঙ্কার, লোভ ভুলে একটি লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। শুধু তাই নয় নজরুলের সংগ্রামী চেতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। তবেই যদি আমরা এই জালেম ফ্যাসিস্ট সরকার হতে মুক্তি পেতে পারি। আর এই পদক্ষেপ যুগান্তকারী পরিবর্তন এনে দিতে পারে।
ছাত্র সংবাদ : নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে দায়ের করা মামলা সরকার প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এটা কি মানবাধিকারের লংঘন নয়? এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য?
মামুন উল হাসিব : ২৮ অক্টোবর ২০০৬ সালে আওয়ামী পেটুয়া বাহিনীর তাণ্ডবে যারা নিহত হয়েছেন এবং যারা গুরুতর আহত হয়েছেন। যারা এই তাণ্ডবের দ্বারা ভীতিকর পরিস্থিতির শিকার, সমগ্র জাতি তাদেরকে কোন দিন ভুলবে না। একটি স্বাধীন জাতি কখনও এমন তাণ্ডবের শিকার হতে পারে না। সেই সময়ে নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে দায়ের করা মামলার সুবিচার পায়নি। বরং আওয়ামী সরকার মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য করেছে। এতে স্পষ্ট যে, আইনের শাসন এই বাংলায় আর অবশিষ্ট নেই। যাও ছিল তা ইতোমধ্যেই হরণ করা হয়েছে। কাজেই মানবাধিকার এটাতো জাদুঘরের পণ্য। সুউচ্চমূল্যে ক্রয় করে এয়ারকুলার যুক্ত বলরুমে শোপিজে সাজিয়ে রাখাই জাতির জন্য কল্যাণকর। যেখানে শোভা পাবে তরতাজা মানবাধিকার।
ছাত্র সংবাদ : স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরও স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে বিভেদ সৃষ্টিকে আপনি কোন দৃষ্টিতে দেখছেন?
মামুন উল হাসিব : এক সময়ের কথিত দেশদ্রোহী আগরতলার ষড়যন্ত্র মামলাধারী দল জানে, বোঝে এই বোঝা কত ভারী। যদি কোন দলের ঘাড়ে এই বোঝা চাপিয়ে দেয়া যায় তবে সে সহজেই নতজানু হতে বাধ্য। তাদের বাস্তবতার তিক্ত অভিজ্ঞতা খুবই রয়েছে। সেই থেকে তারা দেশপ্রেমী। কালের আবর্তে যারা তাদের বিরোধী তারা আজ দেশদ্রোহী, স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি, যুদ্ধাপরাধী তারা দেশের আলো বাতাস গ্রহণ করে ভিন দেশীদের জন্য কথা বলে কাজ করে। তারা কুলাঙ্গার তারা দেশের বোঝা। এই বোঝা কেটে ফেলতে পারলে জাতি মুক্ত। আপাতদৃষ্টে এমনটাই মনে হয়, কিন্তু মুদ্রার এ পিঠ ওপিঠের খবর তো জানা জরুরি। বাংলার মানুষ আজ প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ শিক্ষিত। আর বাকি যারা আছে তারা প্রযুক্তির এই উৎকর্ষতার যুগে সেই দলেই অন্তর্ভুক্ত। তার মানে জাতি আজ অন্ধ নয়। তারা দেখছে কোন সম্প্রদায় পাশের দেশের স্বার্থ রক্ষায় সর্বদা উৎগ্রীব, দেশের বিশাল বিশাল স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে পাশের রাষ্ট্রের স্বার্থকে কারা প্রাধান্য দিচ্ছে। কারা পাশের রাষ্ট্রের সরকার পরিবর্তনে কুণ্ঠিত হয়। কারা পাশের দেশের নতুন সরকারের আজ্ঞাবহ হতে মরিয়া হয়ে ওঠে। কারা পাশের রাষ্ট্রকে মোসাহেবের মতো জি হুজুর জি হুজুর বলতে জাতির অহঙ্কার, গর্ব পদদলিত করতে সঙ্কুচিত হয় না। তারা মনে করে নিজেদের আখের গোছাতে পারলেই, টাকার বিনিময়ে মাথা কিনে ফেলতে পারবেন। কারণ এই ব্যাপারটিতে বাংলাদেশী ভাই বোনেরা বিশ্বাসঘাতকতা করছে না। একটি নোট হলেই চলবে। একদিন দুদিন তো পোলাও খাওয়া চলবে। না হয় সারা বছর বা ৫ বছর নুন আনতে পান্তা ফুরাবে। কাঁচামরিচ কিনতে হবে ৩০০-৪০০ টাকায়। বাকিটুকু আর নাই বা বললাম।
হ্যাঁ বর্তমান সরকারের তুরুপের একটি তাশ হাতে থাকতে তো হবেই। এইটি হচ্ছে জাতিকে বিভক্ত করে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি ও বিপক্ষের শক্তি। এই চালটি চেলে বড় ফায়দা হাসিল করছে বর্তমান সরকার। যে জাতিকে এই বাংলার আলো, বাতাস, মাটিতে পরিপুষ্ট সে জাতি কখনও ঢালাওভাবে দেশদ্রোহী হতে পারে না। এর মধ্যে ‘কিন্তু’ আছে। আমাদেরকে সেই কিন্তুর খোঁজে ঘর ছাড়তে হবে না। একটু চিন্তা করলেই সব দিবালোকের মতো পরিষ্কার। আর তাই জ্ঞানী ভাই বোনদের বলব ওদের জালে পা দেয়ার আগে দেখে শুনে বুঝে নেবেন। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর কেন বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমার পরও স্বাধীনতার পক্ষে বিপক্ষে ইস্যুটি জাতির সামনে আনা হচ্ছে। জাতি আজ মহা সঙ্কটাপন্ন।
ছাত্র সংবাদ : আওয়ামী দুঃশাসনের হাত থেকে জাতিকে মুক্ত করার জন্য সকল ছাত্রসংগঠনের ঐক্যবদ্ধ হওয়া সময়ের অনিবার্য দাবি। এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী?
মামুন উল হাসিব : সর্বদলীয় ছাত্রসংগঠনের ঐক্যবদ্ধ হওয়া সময়ের অনিবার্য দাবি। ছাত্র ও যুবসমাজ একটি জাতির অকুতোভয় সৈনিক। বাংলার কবি-সাহিত্যিকরা সব সময়ই যুবসমাজ ও তরুণদের জয়গান গেয়েছেন। কাজী নজরুল তার যৌবনের গান প্রবন্ধে তরুণদের জয়-জয়কার ধ্বনিতে মুখরিত করেছেন। যৌবনই শক্তি, জড়াজীর্ণতাকে সতেজ করা, অন্ধকারকে আলোকিত করার একমাত্র শক্তি রাখে তরুণসমাজ। আর যদি এই তরুণসমাজ, যুবসমাজ, ছাত্রসমাজ, ঘুমন্ত অবস্থায় থাকে তবে অন্যদের দ্বারা জাতীয় কলঙ্ক মোচন করা সম্ভব নয়। যুব তথা ছাত্র সমাজই পারে জাতীয় যত কলঙ্করূপী বোঝা অপসারণ করে মেঘমুক্ত আকাশ স্বরূপে পরিবেশন করতে। আর তাই সর্বদলীয় ছাত্র-ঐক্য সংঘবদ্ধ হয়ে কাজ করবে যা সময়ের অনিবার্য দাবি।
ছাত্র সংবাদ : সমৃদ্ধ দেশ গঠনের জন্য ছাত্র ও যুব সমাজের উদ্দেশে আপনার বক্তব্য বলুন।
মামুন উল হাসিব : সর্বদলীয় ছাত্র ও যুব সমাজের একজন সদস্য হিসেবে আমি আমার জীবনকে প্রস্তুত করেছি শুধু শুধু বিলিয়ে দিতে নয়। নিজেকে একজন যোগ্য দেশপ্রেমিক হিসেবে গড়ে তুলব। আর নিজের ব্যক্তিজীবন, সমাজ জীবন, পারিবারিক জীবন তথা রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রতিষ্ঠিত করব। সাথে সাথে সৎ, যোগ্য, আদর্শ দেশপ্রেমিক নাগরিক গঠনে অগ্রণী ভূমিকা রাখব। আর এরই ধারাবাহিকতায় জীবনের কঠিন সায়াহ্নে যদি উপনীত হতে হয় তবে পিছপা হবো না।
লেখক : আহবায়ক, জাতীয় ছাত্রসমাজ, কেন্দ্রীয় কমিটি

Comments are closed.